আসসালামু আলাইকুম ফুটবলপ্রেমী বন্ধুরা! ফুটবল মানেই তো এক অন্যরকম উন্মাদনা, আর সেটা যদি হয় ফিফা বিশ্বকাপ, তাহলে তো কথাই নেই। চার বছর পর পর যখন এই ফুটবল মহাযজ্ঞ আমাদের মাঝে ফিরে আসে, তখন চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ফেসবুকের নিউজফিড সবখানেই শুধু ফুটবল নিয়ে ঝড় ওঠে। তবে এবারের অর্থাৎ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ (FIFA World Cup 2026) কিন্তু অন্য যেকোনো বারের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং ঐতিহাসিকভাবে একদম স্পেশাল। কেন স্পেশাল? সেটাই আজ আমরা জানব।
অনেকের মনেই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ কতটি দল অংশগ্রহণ করছে? এবারের বিশ্বকাপের নতুন নিয়ম বা ফরম্যাটটাই বা কেমন? একদম সহজ ভাষায় আজকের এই ব্লগে আমরা ২০২৬ বিশ্বকাপের দল সংখ্যা, নতুন ফরম্যাট, ভেন্যু এবং এর খুঁটিনাটি সব তথ্য নিয়ে আড্ডা দেব। চলুন শুরু করা যাক!
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ কতটি দল খেলছে?
শুরুতেই সরাসরি উত্তরটা দিয়ে দিই। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ মোট ৪৮টি দল অংশগ্রহণ করছে। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন! ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফা (FIFA) তাদের পুরোনো ৩২ দলের ফরম্যাট ভেঙে দল সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, গত ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এবার আরও ১৬টি বেশি দেশ বিশ্বমঞ্চে লড়াই করার সুযোগ পাচ্ছে। দল সংখ্যা এতটা বাড়ার কারণে এবারের টুর্নামেন্টটি হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে জমজমাট আসর।
হঠাৎ কেন দল সংখ্যা বাড়ানো হলো?
ফিফার এই দল সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে ফুটবলের জোয়ার আরও ছড়িয়ে দেওয়া। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ওশেনিয়া অঞ্চলের অনেক চমৎকার ফুটবল খেলা দেশও আগে সীমিত কোটার কারণে বিশ্বকাপে আসতে পারত না। দল সংখ্যা ৪৮ করায় এখন ছোট-বড় অনেক দেশই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুবর্ণ সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে ফুটবল বিশ্বব্যাপী আরও বেশি মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।
এক বিশ্বকাপে তিন দেশ! যৌথ আয়োজক কারা?
ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ফুটবল বিশ্বকাপ একই সাথে তিনটি দেশে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উত্তর আমেরিকার এই তিন শক্তিশালী দেশ হলো:
১. যুক্তরাষ্ট্র (USA)
২. মেক্সিকো (Mexico)
৩. কানাডা (Canada)
এই তিন দেশের মোট ১৬টি শহরে বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি, মেক্সিকোর ৩টি এবং কানাডার ২টি শহর রয়েছে। আর মজার ব্যাপার হলো, আয়োজক দেশ হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডাকে কোনো বাছাইপর্ব খেলতে হয়নি, তারা সরাসরি মূল পর্বে খেলার টিকিট পেয়ে গেছে।
নতুন গ্রুপ বিন্যাস: খেলা হবে কোন নিয়মে?
দল সংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই খেলার নিয়ম বা ফরম্যাটেও বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। চলুন একদম সহজ করে নতুন ফরম্যাটটি বুঝে নেওয়া যাক:
* গ্রুপের সংখ্যা: ৪৮টি দলকে মোট ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে (গ্রুপ ‘এ’ থেকে গ্রুপ ‘এল’)।
* প্রতি গ্রুপে দল: প্রতিটি গ্রুপে মোট ৪টি করে দল রাখা হয়েছে।
* গ্রুপ পর্বের ম্যাচ: গ্রুপ পর্বে প্রতিটি দল নিজেদের গ্রুপের বাকি ৩টি দলের সাথে একটি করে ম্যাচ খেলবে। অর্থাৎ, শুধু গ্রুপ পর্বেই মোট ৭২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
নকআউট পর্বে যাওয়ার নতুন ম্যাজিক নিয়ম
আগে নিয়ম ছিল প্রতিটি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দল সরাসরি ‘লাস্ট ১৬’ বা রাউন্ড অব ১৬-এ চলে যেত। কিন্তু এবার দল বেশি হওয়ায় নকআউট পর্ব শুরু হচ্ছে 'রাউন্ড অব ৩২' (Round of 32) থেকে।
১২টি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল (১২ × ২ = ২৪টি দল) সরাসরি নকআউট পর্বে যাবে। তাহলে বাকি ৮টি দল কীভাবে আসবে? এখানেই টুইস্ট! ১২টি গ্রুপের মধ্যে পয়েন্ট ও গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকা সেরা ৮টি ‘তৃতীয় স্থান অধিকারী’ দলও নকআউট পর্বে যাওয়ার টিকিট পাবে। এই মোট ৩২টি দল নিয়ে শুরু হবে নকআউটের আসল থ্রিলার।
কোন মহাদেশ থেকে কয়টি দল সুযোগ পেল?
দল সংখ্যা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সুবিধা পেয়েছে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কোন মহাদেশ থেকে কতটি দল খেলার সুযোগ পাচ্ছে:
* ইউরোপ (UEFA): ১৬টি দল
* আফ্রিকা (CAF): ৯টি দল (+ ১টি প্লে-অফ)
* এশিয়া (AFC): ৮টি দল (+ ১টি প্লে-অফ)
* দক্ষিণ আমেরিকা (CONMEBOL): Structural হিসেবে ৬টি দল
* উত্তর ও সেন্ট্রাল আমেরিকা (CONCACAF): ৬টি দল (৩ আয়োজক দেশসহ)
* ওশেনিয়া (OFC): ১টি দল (সরাসরি)
নোট: বাকি ২টি দল আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফ ম্যাচের মাধ্যমে তাদের জায়গা নিশ্চিত করেছে।
বিশ্বকাপের সময়সীমা এবং ম্যাচের সংখ্যা
খেলা বাড়ার কারণে এবারের বিশ্বকাপ কিন্তু বেশ লম্বা সময় ধরে চলে।
* মোট ম্যাচ সংখ্যা: আগে বিশ্বকাপে মোট ৬৪টি ম্যাচ হতো, কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে সর্বমোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
* টুর্নামেন্টের সময়কাল: খেলাগুলো শুরু হয়েছে ১১ জুন, ২০২৬ থেকে এবং মেগা ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ১৯ জুলাই, ২০২৬ তারিখে। অর্থাৎ প্রায় ৩৯ দিন ধরে চলে এই ফুটবল উৎসব।
* খেলোয়াড়দের ওপর চাপ: নতুন এই ফরম্যাটের কারণে চ্যাম্পিয়ন হতে হলে একটি দলকে মোট ৮টি ম্যাচ খেলতে হবে, যা আগে ছিল ৭টি।
২০২৬ বিশ্বকাপের আকর্ষণীয় কিছু গ্রুপ
অফিশিয়াল ড্র অনুযায়ী বেশ কিছু গ্রুপে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যেমন:
* গ্রুপ 'সি': এখানে রয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, আফ্রিকার পরাশক্তি মরক্কো, স্কটল্যান্ড এবং হাইতি।
* গ্রুপ 'জে': বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সাথে এই গ্রুপে লড়াই করছে অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া এবং জর্ডান।
* গ্রুপ 'এল': ফুটবল পরাশক্তি ইংল্যান্ডের সাথে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া, পানামা এবং ঘানা।
দর্শকদের মনে উঁকি দেওয়া কিছু সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
১. ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে কতটি দল খেলছে?
উত্তর: ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সর্বমোট ৪৮টি দেশ বা দল অংশ নিচ্ছে।
২. খেলাগুলো কোন কোন দেশে দেখা যাবে?
উত্তর: এবারের বিশ্বকাপ যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
৩. পুরো টুর্নামেন্টে মোট কতটি ম্যাচ হবে?
উত্তর: ৩৯ দিনের এই মহাআয়োজনে সর্বমোট ১০৪টি ম্যাচ খেলা হবে।
4. এবার কি নতুন কোনো দেশ সুযোগ পেয়েছে?
উত্তর: হ্যাঁ, দল সংখ্যা ৪৮ করায় এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের বেশ কয়েকটি নতুন ও উদীয়মান দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে খেলার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে।
শেষ কথা
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফুটবল ইতিহাসের একটি বিশাল মাইলফলক। ৪৮টি দলের অংশগ্রহণ, ৩টি দেশের যৌথ আয়োজন এবং ১০৪টি ম্যাচের এই বিশাল মহাযজ্ঞ কোটি কোটি ফুটবল ভক্তকে এক নতুন রোমাঞ্চের স্বাদ দিচ্ছে। নতুন নিয়ম ও বেশি ম্যাচের কারণে এবারের বিশ্বকাপ যেমন জমজমাট হচ্ছে, তেমনি ছোট দলগুলোর বড় মঞ্চে লড়াই করার স্বপ্নও পূরণ হচ্ছে।