স্পোর্টসের দুনিয়ায় ‘অলিম্পিক গেমস’ শব্দটাই যেন একটা তীব্র ভালো লাগা আর রোমাঞ্চের নাম। চার বছর পর পর যখন এই বিশ্বযজ্ঞের মশাল জ্বলে ওঠে, তখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের চোখ আটকে যায় টিভির পর্দায়। শত শত দেশ, হাজার হাজার অ্যাথলেট সবার বুকে একটাই স্বপ্ন, নিজের দেশের জন্য একটি পদক জেতা। এই মেডেলের পেছনে থাকে বছরের পর বছর ধরে করা রক্ত জল করা পরিশ্রম, চোখের জল আর অদম্য ইচ্ছা। অলিম্পিকের মঞ্চে সোনা, রূপা কিংবা ব্রোঞ্জ যেকোনো একটি মেডেল জেতাও যেখানে একজন ক্রীড়াবিদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, সেখানে এমন কিছু দেশ রয়েছে যারা যুগের পর যুগ ধরে এই মঞ্চে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে। ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে প্রায়ই একটি কৌতূহল জাগে, অলিম্পিকের এই সুবিশাল ইতিহাসে আসলে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণপদক জিতেছে কোন দেশ? সাফল্যের এই চূড়ায় বসার পেছনের গল্পটাই বা কী?
যদি আমরা সর্বকালের পরিসংখ্যানের খাতাটা উল্টে দেখি, তবে একটি দেশের নাম একদম শুরুর দিকে জ্বলজ্বল করবে। তারা আর কেউ নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আধুনিক অলিম্পিকের সেই ১৮৯৬ সালের সূচনা লগ্ন থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত, মেডেল তালিকার একচ্ছত্র রাজা হিসেবে নিজেদের আসন ধরে রেখেছে তারা। গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসে তাদের অ্যাথলেটরা যেভাবে একের পর এক সোনা নিজেদের পকেটে পুরেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এক হাজারেরও বেশি স্বর্ণপদক জিতে তারা এমন এক মাইলফলক ছুঁয়েছে, যা বর্তমানের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। বিশেষ করে সাঁতারের সুইমিং পুল কিংবা ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের রানিং ট্র্যাকে আমেরিকানদের গতি আর ক্ষমতা বছরের পর বছর ধরে প্রতিপক্ষকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছে।
কিন্তু আমেরিকার এই আকাশচুম্বী সাফল্যের রহস্যটা আসলে কোথায়? এটা কি শুধুই তাদের চমৎকার জিনগত সুবিধা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো বড় সমীকরণ? আসলে আমেরিকার এই রাজত্বের মূল ভিত্তি লুকিয়ে আছে তাদের একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের ক্রীড়া কাঠামোয়। সেখানকার স্কুল এবং কলেজগুলোতে খেলাধুলাকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখা যায়। তাদের বিখ্যাত কলেজ স্পোর্টস সিস্টেম বা এনসিএএ প্রতি বছর এমন সব প্রতিভাবান অ্যাথলেট তৈরি করে, যারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে আসার আগেই পেশাদার খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। এর সাথে যুক্ত হয় আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স, বিশ্বমানের কোচিং প্যানেল এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শত শত কোটি ডলারের স্পনসরশিপ। এই সবকিছুর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই আমেরিকাকে অলিম্পিকের চিরন্তন পরাশক্তি বানিয়ে রেখেছে।
আমেরিকার অলিম্পিক ইতিহাসের কথা বলতে গেলে এমন একজন মানুষের নাম না নিলেই নয়, যাকে অলিম্পিকের সমার্থক বললেও ভুল হবে না। তিনি আর কেউ নন, সাঁতারের জলদানব মাইকেল ফেলপস। একক অ্যাথলেট হিসেবে অলিম্পিক ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মেডেল জেতার রেকর্ডটি এই মার্কিন তারকার নিজের দখলে। তিনি অলিম্পিকের বিভিন্ন আসর মিলিয়ে একাই ২৩টি স্বর্ণপদক জিতেছেন! ভাবা যায়? পৃথিবীর বহু দেশ তাদের পুরো অলিম্পিক ইতিহাসে সব অ্যাথলেট মিলিয়েও ২৩টি সোনা জিততে পারেনি, অথচ ফেলপস একাই সুইমিং পুলের নীল জলে ঝড় তুলে সেই কীর্তি গড়ে দেখিয়েছেন। ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে তাঁর এক আসরেই আটটি সোনা জেতার সেই অতিমানবীয় দৃশ্য আজও ক্রীড়াপ্রেমীদের চোখে স্বপ্নের মতো লেগে আছে।
তবে অলিম্পিকের মেডেল লড়াইয়ের গল্পটা কিন্তু সবসময় একতরফা ছিল না। ইতিহাসের পাতায় আমেরিকার এই জয়রথকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। স্নায়ুযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে মাঠের লড়াইটাও রূপ নিয়েছিল এক রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অ্যাথলেটরা যখন অলিম্পিকের ট্র্যাকে নামতেন, তখন তাদের চোখে থাকত মার্কিনদের হারানোর এক তীব্র জেদ। মাত্র কয়েকটি আসরে অংশ নিয়েই তারা প্রায় চারশত স্বর্ণপদক জিতে নিয়েছিল। আজ সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব না থাকলেও, অলিম্পিকের সর্বকালের সেরা সফল দলগুলোর তালিকায় তাদের নাম এখনও দ্বিতীয় স্থানে সগৌরবে টিকে আছে।
গ্রীষ্মের তপ্ত দিনগুলো পেরিয়ে যখন বরফের চাদরে ঢাকা শীতকালীন অলিম্পিকের আসর বসে, তখন কিন্তু এই মেডেলের সমীকরণটা সম্পূর্ণ বদলে যায়। গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে আমেরিকার যে দাপট আমরা দেখি, শীতকালীন অলিম্পিকে তার চেয়েও বড় দাপট দেখায় ইউরোপের ছোট্ট এক দেশ নরওয়ে। বরফের ওপর স্কিইং করা কিংবা স্পিড স্কেটিংয়ের ট্র্যাকে নরওয়ের অ্যাথলেটরা যেন সাক্ষাৎ জাদুকর। হাড় কাঁপানো শীতের এই গেমসে নরওয়ে দেড়শরও বেশি সোনা জিতে মেডেল তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। তবে শীত আর গ্রীষ্ম এই দুই অলিম্পিক মিলিয়ে যদি আমরা সামগ্রিক হিসাব মেলাই, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারেকাছেও কেউ নেই।
সময়ের চাকা ঘোরার সাথে সাথে অলিম্পিকের এই সাম্রাজ্যে এখন এক নতুন রাজপুত্রের উত্থান ঘটেছে। এশিয়ার পরাশক্তি চীন গত কয়েক দশকে অলিম্পিকের মঞ্চে যে অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটিয়েছে, তা পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। টেবিল টেনিসের বোর্ড, ডাইভিংয়ের প্ল্যাটফর্ম, জিমন্যাস্টিকসের ফ্লোর কিংবা ভারোত্তোলনের মঞ্চ চীন এখন প্রতিটি জায়গায় অপরাজেয়। ২০০৮ সালে নিজেদের মাটিতে আয়োজিত বেইজিং অলিম্পিকে চীন তো সোনা জেতার সংখ্যায় আমেরিকাকেও পেছনে ফেলে দিয়েছিল। বর্তমানের প্রতিটি অলিম্পিক আসরে এখন শেষ দিন পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই চলে এই দুটি দেশের মধ্যে। চীন যেভাবে খুব দ্রুত ৩০০ স্বর্ণপদকের গণ্ডি পেরিয়ে ওপরে উঠছে, তাতে আমেরিকার সিংহাসন যে ভবিষ্যতে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
এই পরাশক্তিগুলোর বাইরে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি কিংবা জাপানের মতো দেশগুলোও অলিম্পিকের ট্র্যাকে নিয়মিত নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে আসছে। তবে অলিম্পিক গেমস কেবল এই মেডেলের সংখ্যা বা কোন দেশ কতটি সোনা জিতল, সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অলিম্পিক হলো বিশ্বজুড়ে শান্তি, সম্প্রীতি এবং বন্ধুত্বের এক অনন্য মেলবন্ধন। যেখানে যুদ্ধ-বিগ্রহ ভুলে পৃথিবীর সব দেশের মানুষ এক পতাকার নিচে এসে দাঁড়ায়। আমেরিকার হাজার সোনার রেকর্ডের পাশে যখন কোনো ছোট বা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের একজন অ্যাথলেট বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে নিজের দেশের জাতীয় সঙ্গীত শোনেন, অলিম্পিকের আসল সৌন্দর্য আর সার্থকতা তো লুকিয়ে থাকে ঠিক সেই আবেগঘন মুহূর্তটাতেই।